এক দিক-নির্দেশক নির্মাণে ৩০ লাখ ব্যয় করবে সওজ!

সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতরের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক কারিগরি নির্দেশিকায় বলা আছে, গুরুত্বপূর্ণ জংশনের আগেই ডিরেকশনাল সাইন (দিক-নির্দেশক চিহ্ন) দিতে হবে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সড়ক পরিবহন উইংয়ের কর্মকর্তারা বলেন, ডিরেকশনাল সাইন বসানো হয় সড়কের নিরাপত্তার জন্য। সব সড়কেই এটা বসানোর নিয়ম আছে। ডিরেকশনাল সাইনের মাধ্যমে চালককে সিগন্যাল (সংকেত) দেয়া যে, সামনে বাজার আছে, সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালাতে হবে। হুট করে যাতে ডানে বা বামে মোড় না নিয়ে কিংবা গাড়ির গতি বাড়িয়ে দুর্ঘটনা না ঘটান চালক।

জামালপুর জেলার দিগপাইত-সরিষাবাড়ি-তারাকান্দি সড়কে এমন দুটি ডিরেকশনাল সাইন বসানো হবে। তাতে খরচ ধরা হয়েছে ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ একটি ডিরেকশনাল সাইন বা সাইনবোর্ড বসাতে খরচ পড়বে ৩০ লাখ টাকা!

গত ২২ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ‘জামালপুর জেলার দিগপাইত-সরিষাবাড়ি-তারাকান্দি সড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ’ নামের প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। মোট ৩৭৬ কোটি ৫৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকা খরচের মধ্যে ৬০ লাখে দুটি ডিরেকশনাল সাইনও নির্মাণের অনুমোদন রয়েছে সেখানে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়/সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে সওজ অধিদফতর।সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের ময়মনসিংহ অঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইফুল আলম বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।একনেকে চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে প্রকল্পটি যাচাই-বাছাই করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ।

সড়কের একটি ডিরেকশনাল সাইনে এত খরচ ধরার কারণ জানতে চাইলে বিভাগটির সদস্য (সচিব) শামীমা নার্গিস জাগো নিউজকে বলেন, ‘অনেক সময় আপনারা জিনিসটা যেভাবে দেখেন, সেটা সেরকম নাও হতে পারে। আবার ভুলক্রমে থেকেও যেতে পারে। সেটা আসলে কী– না দেখে বলতে পারব না। দুটা ডিরেকশনাল সাইনের জন্য যদি এত বেশি দাম থাকে, সেটার নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। যদি সেটা না থাকে তাহলে প্যাকেজের মধ্যে নিশ্চয়ই আরও জিনিস আছে।’

মহাসড়কে ২৫ হাজারেও নির্মাণ হচ্ছে একটি ডিরেকশনাল সাইন

বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর সড়কের উন্নয়নে যেসব প্রকল্প গ্রহণ করেছে, তার মধ্যে সাতটি নির্বাচন করে ২০১৯ সালের ১ নভেম্বর জাগো নিউজে আরও একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘এক দিক-নির্দেশক নির্মাণে ব্যয় ২৫ লাখ!’। সেই প্রকল্পগুলোও সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়/সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উদ্যোগে বাস্তবায়ন করছে সওজ অধিদফতর।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২৫ হাজার টাকায়ও একটি ডিরেকশনাল সাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। আবার কোনো প্রকল্পে দুই লাখে, কোনোটায় খরচ করা হচ্ছে এক লাখ। তবে কোনো প্রকল্পে একটি ডিরেকশনাল সাইন নির্মাণে ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ের নজির নেই।

ওই বিশেষ প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, ‘ডোমার-চিলাহাটি-ভাউলাগঞ্জ (জেড-৫৭০৬), ডোমার (বোড়াগাড়ী)-জলঢাকা (ভাদুরদরগাহ) (জেড-৫৭০৪) এবং জলঢাকা-ভাদুরদরগাহ-ডিমলা (জেড-৫৭০৩) জেলা মহাসড়কের যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ’ প্রকল্পে ২৪টি ডিরেকশনাল সাইন স্থাপন করা হচ্ছে। এজন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ছয় লাখ ১২ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি সাইন নির্মাণে খরচ করা হচ্ছে ২৫ হাজার ৫০০ টাকা। ‘নীলফামারী-ডোমার (জেড-৫৭০৭) সড়ক ও বোদা-দেবীগঞ্জ (জেড-৫০০৩) সড়ক (নীলফামারী অংশ) এবং ফুলবাড়ী-পার্বতীপুর (জেড-৫৮৫৭) সড়ক যথাযথ মানে উন্নীতকরণ’ প্রকল্পেও ২৫ হাজার ৫০০ টাকা করে ১০টি ডিরেকশনাল সাইন স্থাপন করা হচ্ছে।

ওই দুই মহাসড়কের প্রতিটি ডিরেকশনাল সাইন নির্মাণে সাড়ে ২৫ হাজার টাকা করে খরচ হলেও অন্যগুলোর কোনোটাতে এক লাখ, কোনোটাতে দুই লাখ টাকা খরচ করা হচ্ছে। এর মধ্যে একটি ‘রাঙ্গামাটি সড়ক বিভাগের অধীন পাহাড়/ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের বিভিন্ন কিলোমিটারে ড্রেনসহ স্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক আরসিসি রিটেইনিং ওয়ার নির্মাণ’ প্রকল্প। এতে ১২টি ডিরেকশনাল সাইনবোর্ড স্থাপনে ব্যয় করা হচ্ছে ২৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটিতে খরচ হচ্ছে দুই লাখ টাকা। আরেকটি হলো ‘শরীয়তপুর (মনোহর বাজার)-ইব্রাহিমপুর ফেরিঘাট পর্যন্ত সড়ক (আর-৮৬০) উন্নয়ন’ প্রকল্প। এতে ২০টি ডিরেকশনাল সাইনবোর্ড নির্মাণে খরচ করা হচ্ছে ৪০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এ প্রকল্পেও প্রতিটি ডিরেকশনাল সাইনবোর্ড নির্মাণে খরচ করা হচ্ছে দুই লাখ টাকা।

‘যাত্রাবাড়ী (মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার)-ডেমরা (সুলতানা কামাল সেতু) মহাসড়ক (আর-১১০) চার লেনে উন্নীতকরণ’ প্রকল্পে আটটি ডিরেকশনাল সাইন নির্মাণে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে আট লাখ টাকা। অর্থাৎ এ মহাসড়কে প্রতিটি ডিরেকশনাল সাইন নির্মাণে খরচ হচ্ছে এক লাখ টাকা করে।

আরও যত খরচ

জামালপুর জেলার দিগপাইত-সরিষাবাড়ি-তারাকান্দি সড়কে ইনফরমেশন সাইন, ট্রাফিক সাইন, সাইন পোস্ট, কনক্রিট গাইড পোস্ট, কনক্রিট কিলোমিটার পোস্ট ও রোড মার্কিং থার্মোপ্লাস্টিক ম্যাটেরিয়ালও বসানো হবে।

তার মধ্যে ছয়টি ইনফরমেশন সাইন স্থাপন করা হবে ছয় লাখ টাকা খরচে। অর্থাৎ প্রতিটি ইনফরমেশন সাইন স্থাপনে খরচ হবে এক লাখ টাকা করে।

৪৩০টি ট্রাফিক সাইন বসানো হবে ২৪ লাখ খরচে। অর্থাৎ প্রতিটি ট্রাফিক সাইন বসাতে খরচ পড়বে পাঁচ হাজার ৫৮১ টাকা।

৪৩০টি সাইন পোস্ট বসানো হবে ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচে। প্রতিটি সাইন পোস্টে খরচ হবে তিন হাজার ১৪০ টাকা করে।

দুই হাজার ২০০টি কংক্রিট গাইড পোস্ট বসানো হবে ৫১ লাখ ৯০ হাজার টাকা খরচে। এর প্রতিটিতে খরচ হবে দুই হাজার ৩৫৯ টাকা করে।

২২টি কংক্রিট কিলোমিটার পোস্ট স্থাপন করা হবে এক লাখ ৯৯ হাজার টাকা খরচে। এর প্রতিটিতে খরচ হবে নয় হাজার ৪৫ টাকা করে।

ছয় হাজার ২২৫ বর্গমিটার রোড মার্কিং-থার্মোপ্লাস্টিক ম্যাটেরিয়াল করা হবে ৬৯ লাখ ৩৫ হাজার টাকা খরচে। প্রতি বর্গমিটার রোড মার্কিং করতে খরচ হবে এক হাজার ১১৪ টাকা করে।

এছাড়া সড়কটি উন্নত ও প্রশস্ত করতে ২৩ দশমিক ৪৮ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ ও কেনা হবে। এতে খরচ হবে ১৬৮ কোটি ৯২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি হেক্টর জমি কিনতে সাত কোটি ১৯ লাখ ৪৫ হাজার ৬৯৮ টাকা করে খরচ করবে সওজ। এগুলোসহ সব খাত মিলিয়ে ৩৭৬ কোটি ৫৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকা খরচ করবে তারা।

About News24

Check Also

ট্রাম্প শিবির: আইনি লড়াই মাত্র শুরু হয়েছে

মার্কিন নির্বাচনে প্রতিপক্ষ জো বাইডেন জয় পেলেও কারচুপির অভিযোগ তুলে এখনো পরাজয় স্বীকার করেননি বর্তমান …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *